মেনু নির্বাচন করুন

গবাদী পশুর খাদ্য চাষাবাদ

 

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে হাল চাষের প্রয়োজনে অনেকেই গবাদিপশু পালন করে থাকে। আবার হালের বলদের সাথে অনেকেই ২/১টি গাভীও পালন করে থাকে। এসব গাভীর অধিকাংশই দেশী এবং তাদের দুধ উৎপাদন মোটেই উল্লেখ্যযোগ্য নয়। তবু যতটুকু দুধ পাওয়া যায় তাঁরা তা বাজারে বিক্রি করে থাকেন। যদিও মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক গাভী তুলনামূলকভাবে বেশি দুধ দেয় তারাও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে দেশে ক্রমশই দুধের অভাব প্রকট হয়েছে Household Income and Expenditure Survey (HIES) ২০০০ অনুযায়ী ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে মাথা পিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩২.৫ মিঃলিঃ এবং ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪২.৭২ মিঃলিঃ (উৎসঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৬)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ২০০ মিঃলিঃ দুধ খাওয়া প্রয়োজন। এদিক বিবেচনায় আমাদের দেশে দুধের উৎপাদন খুবই খারাপ বলা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য দেশে দুধ উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি। তাছাড়া আমাদেরকে বছরে প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার দুধ বা দুগ্ধজাতপণ্য আমদানি করতে হয়। আমরা যদি দেশের গবাদি পশুর সঠিক পরিচর্যা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে অন্যদিকে তেমনি বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

নেপিয়ার ঘাস
দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমেই জাতের উন্নয়ন আবশ্যক। তারপরই আসে খাদ্যের ভূমিকা। খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জনসংখ্যায় খুবই ঘন বসতিপূর্ণ। জমির পরিমাণ অল্প। তাই যেখানে মানুষের খাদ্য উৎপাদনেই নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে গবাদির জন্য খাদ্য উৎপাদন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও যদি কৃষকভাইরা দেখেন যে ঘাস উৎপাদনের ফলে তাঁদের গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে এবং এর লভ্যাংশ দ্বারা অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব, তাহলে তাঁরা গবাদিপশু পালনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। আর কাঁচা ঘাস সহজ প্রাপ্য হলে গাভী পালনও সহজতর হবে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করতে হবে। সেজন্য দরকার ব্যাপকভাবে উচ্চ উৎপাদশীল ঘাস চাষ। কাজেই এ বিষয়ে কৃষক ভাইদের সচেতন করতে হবে।
আমরা আজকে এমনই একটি ঘাস চাষ নিয়ে আলোচনা করবো যার উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় এ ঘাস জন্মানো সম্ভব এবং তা থেকে প্রায় সারা বছরই গবাদির কাঁচা ঘাসের চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। এই ঘাসটির নাম নেপিয়ার।
নেপিয়ার এক প্রকার স্থায়ী ঘাস। দেখতে আখের মত, লম্বা ৬.৫-১৩.০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এই ঘাস দ্রুত বধর্নশীল, সহজে জন্মে, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। একবার রোপন করলে ৩/৪ বছর পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। শীতকালের ২/৩ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই এর উৎপাদন অব্যাহত থাকে। এই ঘাস আবাদের জন্য উঁচু ও ঢালু জমি যেমন বাড়ির পার্শ্বে উঁচু অনাবাদি জমি, পুকুরের পাড়, রাস্তার ধার ও বেড়ীবাঁধ সবচেয়ে উত্তম। ডোবা, জলভূমি কিংবা প্লাবিত হয় এমন অঞ্চলে এই ঘাস আবাদ করা যায় না।
napier grass
জমি নির্বাচনঃ
পানি নিষ্কাশনের জন্য ভাল ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টি বা বর্ষার পানি জমে থাকে না এরূপ জমি নেপিয়ার চাষের জন্য উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এ ঘাস রোপন করা যায়, তবে বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

চাষের সময়ঃ
নেপিয়ার ঘাস সারা বৎসরই রোপন করা যায়। সাধারণতঃ বর্ষা মৌসুমেই রোপন করা ভাল। বর্ষার প্রারম্ভে এই ঘাসের কাটিং বা চারা রোপন করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে চারা বা কাটিং লাগালে প্রথম বছরেই ৩/৪ বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যেতে পারে। চারা বা কাটিং লাগানোর পর যদি রৌদ্র হয় বা মাটিতে রস কম থাকে তাহলে চারার গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে।

জমিচাষ ও রোপন পদ্ধতিঃ
সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করে কাটিং বা চারা লাগাতে হবে। এই ঘাস আখের কাটিং-এর মত কাটিং অর্থাৎ কান্ডের দুই মাথায় কমপক্ষে দু'টি বা তিনটি গিট রেখে কাটতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি। কাটিং ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে রোপন করা উচিত। একটি গিট মাটির নীচে, মধ্যের গিট মাটির সমানে রেখে চারা বা কাটিং অনুমানিক ৪৫০ কৌণিকভাবে লাগাতে হয়। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর অথবা ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে যখন বৃষ্টিপাত কম থাকে তখন নেপিয়ার ঘাস লাগানো উত্তম। অতি বৃষ্টিতে কাটিং লাগালে তা পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মোথা লাগালে অনুরূপভাবে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে গর্তের মধ্যে একটি করে চারা লাগাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি গর্তে কিছু পচা গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা দেয়া উত্তম।
রাস্তা, পুকুরের বাঁধ বা পাহাড়ের ঢালু জমিতে নেপিয়ার চাষ করতে হলে প্রথমে ঢালের আগাছা কোদাল বা কাচি দ্বারা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে কোদাল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা এবং টিএসপি সার দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগিয়ে চার পাশ ভাল করে মাটি দিয়ে চেপে দিতে হবে যাতে চারার শিকড় মাটির সাথে লেগে থাকে।

সার ও পানি সেচ পদ্ধতিঃ
উন্নত জাতের ঘাসের ফলন বেশি পেতে হলে জমিতে প্রয়োজন অনুসারে সার দিতে হয়। জমির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে সার ও পানি সেচ দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্ষার সময় ৫/৭ মাস পানি সেচের প্রয়োজন হয় না, শুধু খরার সময় পানির সেচের প্রয়োজন হয়। পচা গোবর ও ফার্মজাত আবর্জনা, পচানো ঘাস হেক্টর প্রতি প্রায় ৩০০০/৪০০০ কেজি জমি চাষের সময় ভালভাবে ছিটিয়ে দিলে মাটিতে পুরোপুরি মিশে যায়। বেশি ফলন পেতে হলে এর সাথে হেক্টর প্রতি ২২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি টিএসপি এবং ৭৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপনের পর জমিতে চারা লেগে গেলে অর্থাৎ রোপনের প্রায় ১০/১২ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল হয়। প্রত্যেক কাটিং-এর পর দুই সারির মাঝের জমি ভালভাবে লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রথম কাটিং ৬০-৮০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নেপিয়ারের উৎপাদন ভাল হয়। বৎসরে কমপক্ষে দু'বার (আষাঢ়-শ্রাবণ ও মাঘ-ফাল্গুন মাসে মাটি আলগা করে দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে ১০-১২ দিন বিরতিতে এবং শীতকালে ১৫-২০ দিন বিরতিতে পানি সেচ দিলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।

সাথী ঘাস চাষঃ
নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে শুটি চাষ করলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা বাড়ে অন্যদিকে ঘাসের পুষ্টিমাণও বৃদ্ধি পায়। স্থায়ী শুটি যেমন সেন্ট্রোসীমা, পয়রো, সিরাট্রো ইত্যাদি এবং অস্থায়ী শুটি যেমন বারসীম, কাউপি, মাসকলাই ও খেসারী ইত্যাদির চাষ করা যেতে পারে। দুই সারি নেপিয়ারের মাঝে এই ঘাসের চাষ করতে হয়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলনঃ
কাটিং বা মোথা লাগানোর ৬০-৭০ দিন পর প্রথমবার ঘাস সংগ্রহ করা যায় এবং এর পর প্রতি ৬-৮ সপ্তাহ পরপর জমি হতে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। মাটির ৫-৬ ইঞ্চি উপর থেকে ঘাস কাটতে হয়। প্রথম কাটিং-এ ফলন একটু কম হলেও দ্বিতীয় কাটিং থেকে পরবর্তী ২/৩ বছর পর্যন্ত ফলন বাড়তে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ৪-৪-১/২ বছর পর পুনরায় কাটিং বা মোথা লাগাতে হবে। বৎসরে প্রতি হেক্টরে ১৪০-১৮০ টনের মত ঘাস উৎপাদিত হয়। সাইলেজ করার ক্ষেত্রে ঘাসে ফুল ফোটার পূর্বে বা পর পরই কাটা ভাল। এতে খাদ্যমান বেশি থাকে।

খাওয়ানোর নিয়মঃ
জমি থেকে ঘাস কাটার পর ঘাস যাতে শুকিয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। আস্ত ঘাস গবাদিকে খেতে দিলে অপচয় বেশি হয়। তাই মেশিন, দা অথবা কাঁচি দ্বারা ২-৩ ইঞ্চি লম্বা করে কেটে খাওয়ানো ভাল। এই কাটা ঘাস খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
ঘাসের পুষ্টিমান নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ

সংরক্ষণঃ
নেপিয়ার ঘাস রৌদ্রে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক নয়, তবে রাখা যেতে পারে। কাঁচা সবুজ ঘাস ছোট ছোট খন্ড বা টুকরা করে সাইলেজ আকারে সংরক্ষণ করাই উত্তম।

সাবধানতাঃ
নেপিয়ারের জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর অনেক দিন খরা হলে ইউরিয়া হতে নাইট্রেট বা নাইট্রাইট ঘাসের মধ্যে উৎপন্ন হতে পারে এবং পরবর্তীতে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে ওঠা এই ঘাস কেটে খাওয়ানো ঝুকিপূর্ণ। এতে বিষক্রিয়া হতে পারে।
নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করলে বিষক্রিয়ার প্রভাব থেকে গবাদিপশুকে মুক্ত রাখা যায়।
(১) জমিতে সার ছিটাবার ২ (দুই) সপ্তাহের মধ্যে ঘাস কাটা উচিত নয়।
(২) সার ছিটাবার পরে দীর্ঘ দিন খরা থাকার পর হঠাৎ অধিক বৃষ্টিপাতের পর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ঘাস কেটে খাওয়ানো উচিত নয়।
(৩) ঘাস কাটার একমাস পূর্বে সার ছিটানো যেতে পারে।
নেপিয়ার উচ্চ ফলনশীল ঘাস। এই ঘাস চাষের মাধ্যেমে গবাদিপশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা মিটানো সম্ভবপর। কাঁচা ঘাস/সাইলেজের ব্যবহার যথাযথভাবে করতে পারলে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা দ্বারা ক্রমান্বয়ে দেশের দুধের চাহিদা মিটানো যাবে এবং এর ফলে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তা বহুল অংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে দুধের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে করে দুধ উৎপাদন বাড়লে কৃষকের যেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটবে।

গো-খাদ্য হিসাবে সেন্ট্রোসীমার চাষ

সেন্ট্রোসীমার

আমাদের দেশের মানুষ সেই প্রাচীনকাল থেকেই গবাদি পশু লালন-পালন করে আসছে। মাংস, দুধ এবং হাল চাষের জন্য গবাদি পশু নিত্য ব্যবহার্য। আগে গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে কাঁচা ঘাসের ঘাটতি ছিল না। এজন্যই তখন ঘরে ঘরে গরু পালন ও এর দুধ পান নিতান্ত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কালক্রমে এ চিত্র বদলে গেছে। চারণভূমি ও কাঁচা ঘাসের অভাবের ফলে গবাদি পশু পালন এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জমির সবটুকুই মানুষের খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই স্বতন্ত্রভাবে ঘাস উৎপাদনের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ কাঁচা ঘাস ছাড়া গবাদি পশু থেকে কাঙ্খিত দুধ উৎপাদন অসম্ভব। দেশে দুধ ও মাংসের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু এসবের উৎপাদন সেই অনুপাতে মোটেও সম্ভব হচ্ছে না।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণে দুধ ও মাংসের প্রয়োজন ও এর উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি সামপ্রতিককালে অতীব আলোচিত একটি বিষয়। উদ্ভুত সমস্যা উত্তরণের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই কাঁচা ঘাস উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। যেহেতু দেশে আবাদি জমির সবটাই মনুষ্য খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তা প্রায় সারা বছর ধরেই শস্য উৎপাদন কাজে লাগানো হয়, তাই গবাদি পশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা পূরণে বিকল্প পন্থার উদ্ভাবন করতে হবে। পতিত জমি, আম, কাঁঠাল বাগানের মাঝে, উঁচু ঢিবি, বেড়ী বাঁধ ও রাস্তার ঢালে বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী ঘাস চাষ করা যেতে পারে। এ সমস্ত জায়গায় যে ধরনের ঘাস চাষ করা যায় সেগুলির উপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কৃষকভাইদের এ বিষয়ে প্রয়োজনে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। তাই, এপর্যায়ে আজকে আমরা সেন্ট্রোসীমা নামক এক জাতীয় উচ্চ ফলনশীল ঘাস নিয়ে আলোচনা করবো। এই ঘাসটি একদিকে যেমন গবাদি পশুর জন্য উচ্চ পুষ্টি গুণসম্পন্ন অন্য দিকে আবার এর মাটির গুণগতমান বৃদ্ধিতে সহায়ক।
সেন্ট্রোসীমা এক প্রকার লতানো ঘাস এবং এরা সীম বা লাউ গাছের মত উপরের দিকে লতিয়ে ওঠা পছন্দ করে। এটা লিগুম জাতীয় খরা সহিষ্ণু ঘাস এবং অল্প দিনের জন্য জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে অর্থাৎ যদি সীমিত সময়ের জন্য হয় তাহলে এ ঘাসের তেমন ক্ষতি হয় না। এই ঘাসটি লম্বায় প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। লতানো ঘাসটির মূলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুটি হয়। সেন্ট্রোসীমা সাধারণভাবে অন্যান্য ঘাসের সাথে একত্রে চাষ করাই সবচেয়ে ভালো।

জমি নির্বাচনঃ
পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে এমন ধরনের উঁচু ও ঢালু জমি সেন্ট্রোসীমা চাষের জন্য উপযুক্ত । তাছাড়া বিভিন্ন জাতের স্থায়ী ঘাসের প্লট, বাঁধের ঢাল, বেড়া এবং আম-কাঠাল ইত্যাদির বাগানে এই ঘাস চাষ করা যেতে পারে।

বপন সময়ঃ
বর্ষা মৌসুম অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে সেন্ট্রোসীমা বীজ বপনের সঠিক সময়। তবে আগষ্ট মাস পর্যন্ত এর বীজ বপন করা যেতে পারে।

বংশ বিস্তারঃ
এটি লিগুম জাতীয় ঘাস। বীজের মাধ্যমে এর বংশ বিস্তার হয়। প্রতি একরে ৩-৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

জমি চাষ ও বপন পদ্ধতিঃ
এই ঘাস বিভিন্ন স্থায়ী ঘাসের সাথে সাথী ঘাস হিসাবে বপন করাই শ্রেয়। নেপিয়ার, গিনি ইত্যাদি স্থায়ী ঘাসের সাথে বপন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে দুই লাইনের মধ্যবর্তী স্থানে জমির মাটি আলগা করে ২/৩ সেমি গভীর গর্তে বীজ বপন করতে হয়। বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে এই ঘাস চাষ করতে হলে ভালোভাবে জমি চাষ করে এবং মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। হাত লাঙ্গল দিয়ে ৩.২৫ ফুট দূরত্বে ১ ইঞ্চি গভীর গর্ত করে ১-১.৫০ ইঞ্চি পর পর বীজ বপন করতে হয়। ঘাস বড় হতে শুরু করলে মাচা করে দিতে হবে।
বাড়ীর আশে-পাশে বা বেড়ার পাশে ছিটিয়েও এই ঘাস লাগানো যেতে পারে। বেড়ার পাশে এক ফুট প্রস্থে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ভালভাবে জমি তৈরি করতে হবে। এই ঘাস বেড়া পেঁচিয়ে বড় হতে থাকে। প্রথম ৩/৪ সপ্তাহ এটা খুব ধীর গতিতে বৃদ্ধি পায়, সেকারণে এসময়ে সঠিক যত্ন নিতে হবে। গাছের গোড়ায় নিড়ানী দিয়ে আগাছামুক্ত করে দিতে হবে।

সার প্রয়োগঃ
যখন অন্যান্য স্থায়ী ঘাসের সাথে এটা চাষ করা হয়, তখন বাড়তি সারের দরকার হয় না। তবে বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এককভাবে চাষ করা হলে একর প্রতি ২০ কেজি ইউরিয়া, ৫০ কেজি টিএসপি সার দিতে হবে। জমি তৈরির পূর্বে জমিতে টিএসপি সার এবং চারা গজানোর পরে ইউরিয়া সার দিতে হবে। উল্লেখ্য, জমি তৈরির পূর্বে যদি গোবর বা মুরগির বিষ্ঠা যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে রাসায়নিক সার কম প্রয়োজন হয়।

ঘাসাকাটা ও ফলনঃ
নেপিয়ার, গিনি ইত্যাদি স্থায়ী ঘাসের সাথে চাষ করা হলে ঘাস কাটার সময় একত্রে এই ঘাস কাটতে হয়। বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এককভাবে চাষ করলে বীজ তোলার পর ঘাস কেটে গরুকে খাওয়ানো যায়। এই লিগুম ঘাস থেকে বছরে একর প্রতি ১৬-২০ টন পর্যন্ত সবুজ ঘাস উৎপাদন করা সম্ভব।

ঘাস খাওয়ানোর নিয়মঃ
সাধারণত সেন্ট্রোসীমা কাঁচা ঘাস হিসাবে সরাসরি অথবা কেটে টুকরা টুকরা করে খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। যদি একটি গাভীর দৈহিক ওজন ১০০ কেজি হয় তাহলে এর দৈনিক খাদ্য তালিকায় ০.৭৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ১ কেজি শুকনা খড় এবং ৪-৪১/২ কেজি সেন্ট্রোসীমা কাঁচা ঘাস দিতে হবে। তবে যদি এই গাভীটিকে (১০০ কেজি ওজনের) ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় খাওয়ানো হয়, সেক্ষেত্রে ০.৫০ কেজি দানাদার, ২-৩ কেজি সবুজ সেন্ট্রোসীমা, ০.৫ কেজি শুকনা খড় এবং ২-২.৫ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। এই হিসাব বা ফমুর্লানুযায়ী গাভীর ওজন অনুপাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের মোট পরিমাণ নির্ধারণ করে এর অর্ধেক সকালে এবং বাকী অর্ধেক বিকালে খাওয়াতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

"হে" হিসাবে ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতিঃ
সেন্ট্রোসীমায় ফল ধরা শুরু হওয়ার সময় কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে "হে" আকারেও সংরক্ষণ করা যায়। এর জন্য এই ঘাসকে ২/৩ দিন রৌদ্রে ভালভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় বাঁশের আড়া (কেদোল) দিয়ে দিনে ৩/৪ বার নেড়ে দিতে হবে। শুকানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে এতে যেন কোনক্রমেই ১৫% এর বেশি আর্দ্রতা (পানি) না থাকে। তাই ঘাস শুকানোর দিকে যথেষ্ট সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ঘাস সঠিকভাবে শুকালো কিনা তা জানার জন্য এক মুঠা ঘাস হাতে নিয়ে চাপ দিলে যদি পুরাপুরি ভেঙ্গে না যায় (তবে কিছু কিছু ভাঙ্গবে) তাহলে বুঝতে হবে ঘাস শুকানো সঠিক হয়েছে। এ অবস্থায় ঘরে গাদা করে রেখে দিলে তা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকবে।

গাভীকে "হে" খাওয়ানোর নিয়মঃ
আমাদের দেশের গাভীর জন্য মাথা পিছু প্রতিদিন ১.৫-২.০ কেজি "হে" টুকরা টুকরা করে কেটে খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।

সেন্ট্রোসীমা ঘাস চাষের উপকারিতাঃ
* আমিষ, খনিজ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ গো-খাদ্য পাওয়া যায়।
* গাভীকে সবুজ সেন্ট্রোসীমা (লিগুম) খাওয়ানো হলে দুধ উৎপাদন প্রায় ২০% বৃদ্ধি পায়।
* এই ঘাসের শিকড়ে প্রচুর সংখ্যক গুটি জন্মে যা বাতাসের নাইট্রোজেনকে ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে এসব শিকড় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
এই লিগুম ঘাস একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে তেমনি গাভীকে খাওয়ানোর পর গাভীর দুধ উৎপাদনও বৃদ্ধি করে। আমরা যদি নিয়মিতভাবে গাভীকে কাঁচা ঘাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারি তাহলে দুধ উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশের গাভীকে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ নিয়মিত কাঁচা ঘাস সরবরাহ করতে পারি না বলেই দুধ উৎপাদন বিঘি্নত হয়ে থাকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে কাঁচা ঘাসের উৎপাদন বাড়াতে হবে। সে বিবেচনায় সেন্ট্রোসীমা কৃষকভাইদের নিকট একটি প্রয়োজনীয় ফডার হিসাবে সাদরে গৃহীত হবে।

চাষ করুন জাম্বো ঘাস

জাম্বো ঘাস

দুগ্ধ খামারীদের মধ্যে জাম্বো ঘাসের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাঙ্গুড়া উপজেলা পাবনা জেলার একটি ছোট উপজেলা যা প্রায় প্রতি বছর বন্যা কবলিত হয়ে থাকে। ফলে কৃষকদের গাভী পালনে খুব সমস্যা দেখা দেয়। এতদ্বসত্বেও তারা অন্ততপক্ষে গোয়াল ঘরের স্থান বন্যামুক্ত রাখার জন্য মাটি ফেলে উঁচু করেছে। বন্যার পানি সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকে এবং অক্টোবর থেকে আবার নামতে শুরু করে। ফলে, কৃষকরা তাদের জমিতে মাস কলাই, খেসারী ইত্যাদি ছিটিয়ে বপন করে যা গরুকে খাওনোই ছিল তাদের ঐতিহ্য। কিন্তু গত ২০০৭ সালে কৃষকরা উচ্চ মূল্যে যে মাস কলাই ও খেসারী বীজ ক্রয় করে বপন করেছিল তা পর পর দু’বার বন্যার পানিতে ডুবে তাদের মারাত্নক আর্থিক ক্ষতি হয়। কৃষকরা এতে অত্যন্ত হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং গাভী পালনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে। এই অবস্থায় তাদেরকে উচ্চ ফলনশীল ঘাস চাষের প্রতি আহবান জানানো হয়। এরই ফলশ্রুতিতে এখানে উচ্চফলনশীল জাম্বো ঘাস চাষ শুরু হয় ব্যাপকভাবে। কৃষক ভাইয়েরা নতুন ঘাস জাম্বো চাষ করে আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন। জাম্বো ঘাস একটি স্থায়ী সবুজ ঘাস যা যে কোনো আবহাওয়াতে জন্মাতে পারে। তবে যেখানে অল্প বৃষ্টিপাত হয় সেখানে ভাল হয়।

জাম্বো ঘাস চাষ প্রক্রিয়া

মাটি
বেলে মাটি ব্যতীত সব ধরনের মাটিতেই জাম্বো ঘাস চাষ করা যায়। তবে এটেল ও দোআঁশ মাটিতে ফলন বেশি হয়। মাটির PH ৬-৮ এর মধ্যে হলে ভাল হয়।

বপনের সময়
সারা বৎসর এই ঘাস চাষ করা যায়। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে চাষ করলে বন্যার পানি আসার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় চার থেকে পাঁচ বার কাটা যায়।

জমি তৈরি
২-৩ বার মাটি চাষ করে ঘাস রোপণ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

বপন পদ্ধতি ও বীজের পরিমাণ
এই ঘাসের বীজ ১ ফুট পরপর লাইন করে ৬ ইঞ্চি পরপর ২টি বীজ প্রতি গর্তে বপন করা যায়। এছাড়া ছিটিয়েও বপন করা যায়। প্রতি বিঘা জমিতে লাইন করে বপন করলে ৩-৪ কেজি বীজ লাগে। এছাড়া ছিটিয়ে বোনা হলে ৫-৬ কেজি বীজের দরকার হয়।

সার প্রয়োগ
বিঘা প্রতি গোবর সার ১৫০০-২০০০ কেজি, ডিএপি সার ১৫-২০ কেজি ও ইউরিয়া সার ৫ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। প্রতি মাসে ঘাস কাটার পর ৫ কেজি ইউরিয়া সার ছিটিয়ে সেচ দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

কাটিং
বপন করার ৪৫/৫০ দিন পর প্রথম বার কাটা যায় এবং পরে প্রতি মাসে ১ বার করে কাটা যায়। ১ বিঘা জমিতে উৎপাদন প্রায় ৮০০০-১০০০০ কেজি হয়ে থাকে যার মূল্য প্রায় ৫০০০-৬০০০ হাজার টাকা।

ঘাসের পরিচর্চা
এই ঘাসের জন্য কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। প্রতিবার কাটার ৭ দিন পর সেচ দিতে হয় এবং ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

ঘাসের গুণাগুণ
জাম্বো ঘাস গরুর খাদ্য হিসাবে অতি উত্তম। এ ঘাস ৯-১৮% আমিষ সমৃদ্ধ এবং এর পরিপাচ্যতা (digestibility) ৫৬-৬২%। প্রতি ৩০ দিন অন্তর ২-৩ ফুট হলে কাটা যায়। গরুকে ছোট করে কেটে খাওয়ানো উচিত। এই ঘাসকে সাইলেজ করেও সংরক্ষণ করা যায়। এই ঘাস গরুকে খাওয়ানো হলে গরুর দুধ বৃদ্ধি পায় এবং দুধের চর্বির পরিমাণ (fat %) বেশি হয়। ফলে কৃষকরা লাভবান হন।

খেসারীর সাথে জাম্বো ঘাস চাষ
বন্যার পানি যখন নেমে যায় তখন জমিতে পলিমাটি পড়ে। কৃষকরা সাধারণত সেখানে খেসারী ছিটিয়ে বপন করেন। সেই বিনা চাষে খেসারীর সাথে প্রতি বিঘা জমিতে দুই-আড়াই কেজি জাম্বো ঘাসের বীজ ছিটিয়ে বপন করলে খেসারী ও জাম্বো ঘাসের উৎপাদন ভাল হয়। পরীক্ষামূলকভাবে দেখা গেছে, জাম্বো ঘাসকে অবলম্বন করে লতিয়ে লতিয়ে খেসারী গাছ বড় হতে থাকে। খেসারী এবং জাম্বো ঘাস ৪৫/৫০ দিনে কাটা যায়। খেসারী লিগুউমিনাস জাতীয় হওয়ায় এদের শিকড়ে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে। ফলে, কম পরিমাণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করে বেশি পরিমাণ জাম্বো ঘাস উৎপাদন করা সম্ভব। এজন্য কৃষকদের উচিত বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় সাথে সাথে খেসারী ও জাম্বো ঘাসের বীজ বপন করা। এতে গো-খাদ্যের অভাব দূর করা যায়। কারণ বন্যার সময় ঘাস নষ্ট হয়ে যায় এবং গবাদিপশু ঠিক মতো খাদ্য পায় না। এছাড়া পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন প্রতিকূলতার ফলে এদের স্বাস্থ্যও খারাপ হয়ে যায়। এ কারণে এদের দুধ উৎপাদনও হ্রাস পায়। তাই খেসারী ও জাম্বো ঘাস এক সাথে চাষ করলে কৃষকের গো-সম্পদ রক্ষা করা যাবে।

ভুট্টার সাথে জাম্বোর চাষ
যে সমস্ত জমিতে আমন ধান কাটা হয় সে সমস্ত জমিতে কৃষকরা ভুট্টার সাথে জাম্বো ঘাসের চাষ করতে পারেন। জমি তৈরি করে ২-৩ চাষ দিয়ে প্রয়োজনীয় গোবর ও ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। জাম্বো ঘাসের বীজ বিঘা প্রতি ৫/৬ কেজি ও ভুট্টার বীজ ৩/৪ কেজি ছিটিয়ে রোপণ করলে ৪৫/৫০ দিনের মধ্যে প্রথম কাটা যায়। ভুট্টা ও জাম্বো ঘাসের উৎপাদন বিঘা প্রতি ২০০ কেজি করা সম্ভব। যেহেতু জাম্বো ঘাসের প্রথমে বীজ থেকে একটি কুঁড়ি বের হয় সেজন্য প্রথম কাটায় উৎপাদন কম হয়। কিন্তু জাম্বো ও ভুট্টা ঘাসের মিশ্র চাষে প্রথম কাটায় উৎপাদন বেশি করা যায়। দ্বিতীয় কাটাতে ভুট্টা না থাকায় জাম্বো ঘাসে প্রচুর পরিমাণে কুঁড়ি গজায়। এর ফলে জাম্বো ঘাসের উৎপাদন বেশি হয়ে থাকে। সুতরাং এই মিশ্র পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করা হলে ঘাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

গো-খাদ্য হিসাবে গিনির চাষ

কৃষি প্রধান দেশ হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কম-বেশি কৃষির উপর নির্ভরশীল। যদিও বর্তমানে হাল চাষের কাজ কলের লাঙ্গল দিয়ে করা হয়। তবুও গ্রাম-বাংলার জনপদে কৃষির বেশির ভাগ কাজেই গবাদি পশু ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। গ্রাম এলাকায় কৃষকেরা বিভিন্ন প্রয়োজনে গরু পালন করে থাকে। হয় হাল চাষের কাজে না হয় তো দুধের গরু হিসাবে এদের পালন করে থাকে। তবে দেশে গবাদিপশু পালন ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছে। আর গরুর সংখ্যা কমার প্রধান কারণ হলো গো-খাদ্যের অভাব। গো-খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাসের অভাব খুবই প্রকট। এই কাঁচা ঘাসের সরবরাহ ত্বরান্বিত করতে না পারলে আগামীতে গবাদি পশু পালন হুমকির সম্মুখীন হবে বলে মনে করা হয়।
এক তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু দৈনিক ৩২.৫ মিলি দুধ খায় (উৎসঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০০৬)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার হিসাব অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ২০০ মিলি দুধ খাওয়া প্রয়োজন। এই বিশ্লেষণ থেকে একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মানুষ দৈনিক মাথাপিছু গড়ে অতি নগন্য পরিমাণে দুধ পান করে থাকে। দেশে গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানিতে বছরে প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশের শিশুরা যে গুঁড়া দুধ খায় তা যে আসলে কি এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে বিতর্ক রয়েছে। মায়ের দুধ ৪ মাস বয়স থেকে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত হয় না। তাই পুষ্টিবিদরা ৪ মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুদেরকে গরুর তরল বিশুদ্ধ দুধ খাওয়াতে বলে থাকেন। কিন্তু গরুর তরল দুধের অপ্রতুলতায় শিশুরা তা পায় না বললেই চলে। ফলে শিশুরা গুঁড়া দুধ বা অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য খেতে বাধ্য হচ্ছে। এই গুঁড়া দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য খেয়ে আমাদের শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। আগামী প্রজন্ম পুষ্টিহীন ও দূর্বল হয়ে বেড়ে উঠছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদেরকে দুধ উৎপাদন বাড়াতে হবে। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গবাদি পশুর জাত উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতের উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য চাহিদাপূরণ দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাসের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশে কাঁচা ঘাসের সরবরাহ খুবই কম। তাই যে কোনো মূল্যে কাঁচা ঘাস উৎপাদন বাড়াতে আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ খুবই ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এদেশে যে জমি আছে তা দিয়ে মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ প্রায় সমস্ত জমিই মনুষ্য খাদ্য-শস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। গো-খাদ্য উৎপাদনে আর কোনো জায়গা থাকছে না। এ পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবহৃত কৃষি ও ফলের বাগান বা উচুঁ পরিত্যক্ত বা পতিত জমিতে ঘাস চাষ বিষয়ে কৃষক ভাইদেরকে সচেতন করে তুলতে হবে। এর ফলে ঘাস উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা দিয়ে কৃষক ভাইয়েরা গবাদির খাদ্য চাহিদা মিটাতে সক্ষম হবেন বলে আশা করা যায়। এতে করে আমাদের কাঙ্খিত দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। প্রতিহত হবে দুধ আমদানি। সাশ্রয় হবে দেশের অর্থ। সুস্থ্য-সবল হয়ে বেড়ে উঠবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।
আজ আমরা এমন একটি ঘাস নিয়ে আলোচনা করবো যার উৎপাদন বেশি। দেশের সকল এলাকায় জন্মে। এমন কি আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারী ও অন্যান্য বাগানে এই ঘাস চাষ করা যায়। কৃষক ভাইয়েরা যদি আধুনিক কলা-কৌশল ব্যবহারে সচেতন হন তাহলে কাঙ্খিত ঘাস উৎপাদন সম্ভব। এ ঘাসটির নাম গিনি।
গিনি গ্রীষ্মমন্ডলীয় স্থায়ী ঘাস। আফ্রিকা-এর আদি বাসস্থান। ঘাসটি ১৭৯৩ সালে আফ্রিকা হতে ভারতে পরিচিতি লাভ করে। গিনি দেখতে অনেকটা ধান গাছের মত। এতে নেপিয়ার ও পারা ঘাসের তুলনায় জলীয় ভাগ কম এবং পুষ্টিমান বেশি। কান্ড চ্যাপ্টা ও পাতা অমসৃন। কান্ড ও পাতায় কোনো সুঙ (Cilia) নেই।

জমি নির্বাচন
গিনি ঘাস উঁচু ও ঢালু জমিতে ভাল হয়। ছায়াযুক্ত জমিতেও এ ঘাস জন্মে। কাজেই আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারী ও অন্যান্য বাগানে এ ঘাস লাগানো যায়। স্যাঁতস্যাঁতে জলাবদ্ধ নিচু জমিতে এ ঘাস ভাল হয় না।

বংশ বিস্তার
এ ঘাস বীজ উৎপাদনে সক্ষম। বীজ ও মোথা দুই পদ্ধতিতেই গিনি ঘাসের চাষ করা যায়।

চাষের সময়
গিনি ঘাস বৈশাখ হতে জ্যৈষ্ঠ মাস অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির পরেই রোপন করতে হয়। বেশি বৃষ্টি বা জলাবদ্ধ অবস্থায় চারার গোড়া পচে যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে মাটিতে প্রচুর রস থাকলে অথবা পানি সেচের সুবিধা থাকলে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে রোপণ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

জমি চাষ ও রোপণ পদ্ধতি
জমি ২/৩টি চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হবে। এর পর বড় মোথা হতে ৪/৫টি ছোট চারা তৈরি করতে হবে। চারাগুলি ৭/৮ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ২/৩ ফুট, এক গাছ হতে অন্য গাছের দূরত্ব ১ ফুট এবং ২/৩ ইঞ্চি মাটির গভীরে লাগাতে হবে। চারার গোড়া ভালোভাবে মাটি দিয়ে টিপে দিতে হবে।

চারা ও বীজের পরিমাণ
সারি থেকে সারি ২ ফুট এবং গাছ থেকে গাছ ১-১.৫ ফুট দূরত্বে লাগালে একরে প্রায় ১২,০০০ চারার দরকার হয়। বীজের ক্ষেত্রে প্রতি একরে বীজের পরিমাণ ৩-৪ কেজি।

সার ও সেচ প্রয়োগ
জমির উর্বরা শক্তির উপর নির্ভর করে ঘাসের উৎপাদন। জমি তৈরির সময় প্রতি একরে কমপক্ষে ৪ টন গোবর বা ১ টন মুরগির বিষ্ঠা এবং ৪৫ কেজি টিএসপি সার দিতে হবে। চারা রোপনের পরে চারা মাটিতে ধরে গেলে একর প্রতি ৪০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া প্রতিবার ঘাস কাটার পর একর প্রতি ৪০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া প্রয়োগের সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে সার প্রয়োগ করে সেচ দিতে হবে।

সাথী ঘাস
গিনি ঘাসের সাথে শুটি যেমন সেন্ট্রোসীমা, সিরাট্রো, গ্লাইসিন ইত্যাদি সাথী ঘাস হিসাবে চাষ করা যেতে পারে। এ সমস্ত শুটি গিনি ঘাস লাগানোর সময় দুই চারার মধ্যবর্তী স্থানে অথবা ছিটিয়ে বপন করা যায়।

ঘাসের পরিচর্যা
সারির মাঝের ফাঁকা জায়গা ঘাস কাটার পর পরই আলগা করে দিতে পারলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। যদি প্রত্যেকবার ঘাস কাটার পর সম্ভব নাও হয়, তবে অন্তত বছরে এক বা দুই বার মাটি আলগা করে দিতে হয়। মাটি আলগা করে সার ও পানি দিতে পারলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলন
গিনি ঘাস লাগানোর ৬০-৭০ দিন পরই প্রথম বার ঘাস কাটা যায়। পরবর্তী ৪০-৪৫ দিন পরপর কাটা যায়। ঘাসের খাদ্যমান বেশি পেতে হলে কচি অবস্থায় কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াতে হবে। ঘাস মাটি হতে ৪/৫ ইঞ্চি রেখে কাটতে হবে। ভাল যত্ন বা পরিচর্যা করলে এই ঘাস বছরে ৭/৮ বার কাটা যেতে পারে। ভাল ব্যবস্থাপনায় একর প্রতি প্রায় ২০-৩০ টন কাঁচা ঘাস উৎপন্ন হয়।

গিনি ঘাসের খাদ্য মান

ঘাস খাওয়ানোর নিয়ম
গরু মাঠে চরিয়ে কাঁচা ঘাস হিসাবে গিনি ঘাস খাওয়ানো যেতে পারে। তবে মাঠ থেকে কেটে এনে খাওয়ানোই উত্তম। এক্ষেত্রে ২/৩ ইঞ্চি টুকরা করে শুকনা খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো ভাল। যদি একটি গাভীর দৈহিক ওজন ১০০ কেজি হয়, তা

হলে-এর দৈনিক খাদ্য তালিকায় ১.০ কেজি দানাদার খাদ্য, ১.৪০ কেজি শুকনা খড় এবং প্রায় ৪.০ কেজি গিনি ঘাস সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে যদি এই গাভীকে (১০০ কেজি ওজনের) ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় খাওয়ানো হয় সেক্ষেত্রে ০.৫ কেজি দানাদার খাদ্য ১.০ কেজি শুকনা খড়, ২.৫-৩.০ কেজি সবুজ গিনি ঘাস এবং ২-২.৫ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় প্রতিদিন সরবরাহ করা যেতে পারে।
এই হিসাব অনুযায়ী গাভীর শারীরিক ওজন অনুপাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের মোট পরিমাণ নির্ধারণ করে-এর অর্ধেক সকালে এবং বাকী অর্ধেক বিকালে খাওয়াতে হবে। এর সাথে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

সংরক্ষণ
গিনি ঘাস কচি অবস্থায় কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে “হে” করে রাখা ভাল। তবে এই ঘাস সাইলেজ করেও রাখা যায়।
গাভীর দুধ উৎপাদন ও সু-স্বাস্থ্যের জন্য কাঁচা ঘাসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কাঁচা ঘাসের সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া মাংস ও দুধ উৎপাদন বাড়ানো অসম্ভব প্রায়। সেক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল ঘাস হিসাবে গিনি বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চাষ হতে পারে। আমাদের জমির স্বল্পতা আছে সত্য, তবে পরিত্যাক্ত উঁচু জমি, বিভিন্ন ফলের বাগানে এ ঘাস চাষ করে ঘাস উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। এ জাতীয় ঘাস সঠিক নিয়মে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হলে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা যায়। এতে করে মানুষের পুষ্টি চাহিদা যেমন পূরণ হবে তেমনি গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধ পণ্য আমদানি কমবে। পলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাববান হবে।

গো-খাদ্য আলফালফা চাষ

দেশে গবাদিপশু পালনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে গো-খাদ্য বিশেষ করে কাঁচা ঘাসের সঙ্কট। দেশে ঘাস চাষের জন্য স্বতন্ত্র কোনো জমি নেই। মোট আবাদযোগ্য যে জমি রয়েছে তা সারা বছরই মানুষের খাদ্যের প্রয়োজনে শস্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ঘাস চাষের জন্য কোনো জমি অবশিষ্ট থাকে না।
খাদ্যশস্য উৎপাদনকে মানুষ লাভজনক ভেবেই ঘাস চাষকে গুরুত্ব দেয় না কিন্তু গবাদিপশু খামারী যদি নিজের খামারের গাভীর জন্য ঘাস চাষ করেন তাহলে সেটা লাভজনকই হয়। এটা এভাবে ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। এক বিঘা জমিতে শস্য চাষ করে যে অর্থ উপার্জন করা যায় ঠিক সেই পরিমাণ জমিতেই দুগ্ধবতী গাভীদের জন্য ঘাস চাষ করে দুধ উৎপাদন বাবদ বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।
গবাদিপশুর জন্য বিভিন্ন জাতের উচ্চ ফলনশীল ঘাস চাষ করা যায়। উচ্চ ফলনশীল সকল ঘাসেরই পুষ্টিমান উন্নত মানের হয়ে থাকে তবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়ে থাকে। আলফাআলফা এ জাতীয় একটি ঘাস। এ ঘাস সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
আলফাআলফা একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের ঘাস। এজন্য এটাকে “পশু খাদ্যের রাণী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ঘাস লুছার্ণ নামেও পরিচিত। এটা লিগুমজাতীয় ঘাস এবং একবার চাষ করলে ৪-৫ বছর পর্যন্ত ঘাস সংগ্রহ করা যায়।
কারো কারো মতে আলফালফা বা লুছার্ণ-এর উৎপত্তি পশ্চিম এশিয়ায়। তবে ইরানে প্রথম চাষ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ভারতবর্ষে এ ঘাসের প্রচলন হয় ১৯০০ সালে। এই ঘাস সারা পৃথিবীতেই চাষ করা হয়ে থাকে। তবে আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি আলফালফা উৎপাদিত হয়।

আলফাআলফার গুণাগুণ
আলফালফা ঘাস সরগাম ঘাসে অপেক্ষা প্রায় ৫ গুণ বেশি আমিষ এবং প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন থাকে। দাস ও খুরামা ১৯৬৪ সালে গবেষণা করে দেখেছেন ফুল ফোটার আগে আলফাআলফা ঘাস কাটলে তাতে ৩% আমিষ এবং ১৭.৪% অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান থাকে। তাছাড়াও এতে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালশিয়াম ও কেরোটিন এবং সামান্য কিছু ফসফরাস থাকে।

জমি নির্বাচন
আলফালফা চাষের জন্য বেলে-দো-আঁশ মাটির চেয়ে কাদা মাটি বেশি গ্রহণযোগ্য তবে জলাবদ্ধ ভূমি ছাড়া সব ধরনের জমিতেই এ ঘাস চাষ করা যায়। এই ঘাস অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না।

বংশ বিস্তার
আলফালফা বীজের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে থাকে।

চাষের সময়
আলফালফা শীতকালের যে কোনো সময় বপন করা যেতে পারে। তবে বপনের উত্তম সময় অক্টোবর হতে জানুয়ারী মাস।

জমি চাষ ও রোপন পদ্ধতি
জমিতে পর্যাপ্ত গোবর সার ছিটিয়ে ২/৩ বার চাষ ও মই দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। পরে একর প্রতি ৫০-৭০ কেজি সুপার ফসফেট মিশিয়ে দিতে হবে।
আলফালফা বীজ ছিটিয়ে বা সারি করেও রোপন করা যায়। ছিটিয়ে রোপন করলে একর প্রতি ৫-৭ কেজি এবং ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি করে রোপন করলে ৪-৬ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। এক সাথে ৩/৪টি বীজ গর্তের মধ্যে ১.২৫-২.৫ সেমি গভীরে রোপন করতে হয়।

সার ও পানি সেচ
আলফালফা ডালজাতীয় (লিগুম) ঘাস তাই এরা নাইট্রোজেন সংযোজন ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে বাতাস হতে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন সংযোজন করতে পারে। পানি সেচের পর প্রতি বছর একর প্রতি ৮ কেজি নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলে লাভজনক ঘাস উৎপন্ন হয়ে থাকে।
ঘাস চাষের জন্য পানির প্রয়োজন হয় যথেষ্ট। জমিতে ঘাস ভালোভাবে না জন্মানো পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পানি সেচ দিতে হয়। তবে পরবর্তীতে প্রতি ২০ দিন পর সেচ দিলেও চলে।

ঘাসের পরিচর্যা
ঘাসের ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার ও মাটি আলগা করে দিতে হয়। এতে ফলন ভালো পাওয়া যায়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলন
২-৩ ইঞ্চি উপর হতে ঘাস কাটতে হয়। এতে অপচয় কম হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ফলনও বেশি হয়। প্রথম বার ফুল ফোটার সময় কাটতে হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৩৫-৪০ দিন পর পর ঘাস কাটা যেতে পারে। বছরে এই ঘাস ৮/১০ বার কাটা যায়। একর প্রতি প্রায় ২৫-৩০ টন/বছর উৎপাদিত হয়ে থাকে।

ঘাস খাওয়ানোর নিয়ম
এটা যেহেতু লিগুম ঘাস তাই তা নন-লিগুম ঘাসের চেয়ে কম লাগে। কারণ লিগুম ঘাসে আমিষের পরিমাণ বেশি থাকে। একটি গাভীর দৈহিক ওজন ১০০ কেজি হলে এর দৈনিক খাদ্য তালিকায় ০.৭৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ১ কেজি শুকনা খড় এবং ৪.০ কেজি কাঁচা আলফালফা ঘাস সরবরাহ করা উচিত। তবে গাভীকে ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় খাওয়ানো হলে ০.৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ২.৫ থেকে ৩ কেজি কাঁচা সবুজ আলফালফা ঘাস এবং ২ থেকে ২.২৫ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় প্রতিদিন সরবরাহ করা যায়। এই হিসাব অনুযায়ী গাভীর ওজন অনুপাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের মোট নির্ধারণ করে এর অর্ধেক সকালে এবং বাকী অর্ধেক বিকালে খাওয়াতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি প্রদান করতে হবে।

ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতি
ঘাসে ফল হওয়া শুরুর পূর্বে কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে “হে” আকারে সরবরাহ করা যায়। এজন্য কাটা ঘাস ২-৩ দিন রৌদ্রে ভালোভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় বাঁশের আড়া দিয়ে দিনে ৫/৬ বার নাড়া চাড়া করতে হয়। ভালোভাবে শুকানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘাসে যেন ১৪%-এর বেশি আর্দ্রতা না থাকে। এজন্য ঘাস শুকানোর সময় এদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। ঘাস ঠিকমতো শুকিয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য এক মুঠা ঘাস হাতে নিয়ে চাপ দিলে যদি পুরাপুরি ভেঙ্গে না যায় তাহলে বুঝতে হবে ঘাস সঠিকভাবে শুকিয়েছে। এই শুকনা ঘাস ঘরে গাদা করে দীর্ঘদিন রেখে দেয়া যায়।
আলফালফা ঘাস নিয়মিতভাবে গাভীকে খাওয়ানো করা হলে দুধ উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া এতে নন-লিগুম ঘাসের চেয়ে বেশি মাত্রায় আমিষ থাকে বলে আমিষের চাহিদা পূরণেও সহায়তা করে। তাছাড়া আলফালফা ঘাসের শিকড়ে যে “নডিউল” জন্মে তা নাইট্রোজেন (N2) সরবরাহ করে মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে।

গো-খাদ্য হিসাবে বারশিম চাষ

দেশে গবাদিপশু পালনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে গো-খাদ্যের অভাব। মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনে দেশের আবাদযোগ্য জমির প্রায় সবটাই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই গবাদি পশুর জন্য ঘাস চাষের কোনো জমি অবশিষ্ঠ থাকেনা। এক্ষেত্রে স্বল্প জমির বহুমাত্রিক ব্যবহারের প্রযুক্তিকে অবলম্বন করে গবাদিপশু পালনে মনোযোগ দিতে হবে। গবাদিপশুর জন্য বিভিন্ন ধরনের উচ্চ ফলনশীল ঘাস চাষ করা হয়ে থাকে। উচ্চ ফলনশীল সব ধরনের ঘাসেরই পুষ্টিমান মোটামুটি উচ্চ পর্যায়ের তবে ফলনে পার্থক্য থাকে। এপর্যায়ে আমরা যে ঘাস নিয়ে আলোচনা করবো সেটার নাম হচ্ছে “বারশিম”।
বারশিম বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। এটা সর্বপ্রথম মিশর হতে ভারতবর্ষে এনে চাষ করা হয় এবং তখন থেকে রবি মৌসুমে এটা গো-খাদ্য হিসাবে চাষ শুরু হয়। বহুবর্ষজীবী ডাল জাতীয় (লিগিউম) বারশিম দুগ্ধবতী গাভীর জন্য অত্যন্ত উপকারী।

জমি নির্বাচন
বারশিম দো-আঁশ মাটিতে ভাল জন্মে। তবে ১৫-২০০সে তাপমাত্রায় এর উৎপাদন খুব ভালো হয়।

রোপণ সময়
অক্টোবর হতে নভেম্বর পর্যন্ত বীজ বপনের উৎকৃষ্ট সময়।

জমি চাষ ও রোপণ পদ্ধতি
বারশিম বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য জমি ভালোভাবে চাষ করা দরকার। জমিতে ২/৩ বার চাষ করে আগাছামুক্ত করতে হবে। ভালো ফলন পাবার জন্য জমিতে পর্যাপ্ত গোবর বা আবর্জনা-পচা সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া একর প্রতি ২৫ কেজি নাইট্রোজেন সার দেয়া যেতে পারে।

বীজের পরিমাণ
প্রতি একর জমিতে ৮-১০ কেজি পরিমাণ বারশিম বীজের প্রয়োজন হয়। ভালো উৎপাদন পেতে একর প্রতি ১০ কেজি বীজ ব্যবহার করা উচিত।

বপন পদ্ধতি
বারশিম বীজ নিম্নোক্ত তিন পদ্ধতিতে বপন করা যায়
(ক) রিলে পদ্ধতিতে আমন ধানের সাথে
আমন ধান কাটার ৩ (তিন) সপ্তাহপূর্বে যখন মাটি ভেজা থাকে তখন ধান ক্ষেতে বারশিম বীজ বপন করা যেতে পারে।
(খ) বীজতলা পদ্ধতি
জমি খুব ভালোভাবে চাষ করে বীজ ছিটিয়ে হালকা মই দিতে হবে যাতে বীজ মাটির বেশি নীচে চলে না যায়।
(গ) জমি কাদা করে বীজ বোনা
জমি ভালোভাবে চাষ করে মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। এরপর জমির উপর ২/৩ ইঞ্চি পানি জমা করতে হবে। ছিটিয়ে বীজ বপন করা হলে উক্ত পানি ধীরে ধীরে বের করে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।

সার প্রয়োগ
যেহেতু বারশিম শুটিজাতীয় ঘাস সেহেতু নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন হয় কম। তবে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ফসফেট সার প্রয়োগ করতে হবে। এজন্যে জমি তৈরির সময় একর প্রতি ৫০ কেজি টিএসপি এবং চারা গজানোর পর ১৮ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রদান
বারশিমের জন্য সেচের প্রয়োজন হয়। জমির আর্দ্রতার কম-বেশির উপর সেচ নির্ভরশীল। শুকনো মৌসুমে দো-আঁশ মাটিতে ২০ হতে ২৫ দিন পর পর সেচ দেয়া যেতে পারে।

মিশ্র চাষ
শীতের প্রাক্কালে নেপিয়ার অথবা অন্যান্য স্থায়ী ঘাসের সাথে মিশ্র শস্য হিসাবে বারশিম চাষ করা যায়। শীতকালে নেপিয়ার, গিনি বা ইসপ্লেন্ডিডা ঘাসের বৃদ্ধি কমে যায়। অথচ সে সময় এ ঘাস বেশ ভালো জন্মে। উল্লেখ্য, এ ঘাস মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সাহায্য করে।

পরিচর্যা ও ঘাস কাটা
বারশিম ঘাসের তেমন একটা পরিচর্যার দরকার হয়না। তবে ঘাস কাটার কয়েকদিন অর্থাৎ প্রায় ১০ দিন পূর্বে সেচ প্রদান করা যেতে পারে। এই সেচ প্রদানের ফলে পরবর্তী ঘাস কাটার সময় বেশি ফলন পাওয়া যায়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলন
সাধারণত মাটির উপর এক থেকে দেড় ইঞ্চি রেখে বারশিম কাটতে হয়। ঘাস কেটে গবাদিপশুকে সরাসরি অথবা অন্য কোনো নিুমানের ঘাসের সাথে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়। ব্যবস্থাপনা ভালো হলে এ ঘাসের ফলন একর প্রতি ২৫-৫০ টনের মত হয়।

ঘাস খাওয়ানোর নিয়ম
গবাদিপশুকে মাঠে চরিয়ে কাঁচা ঘাস হিসাবে বারশিম খাওয়ানো যেতে পারে। তবে ঘাস কেটে এনে খাওয়ানোই উত্তম। এটা যেহেতু লিগুম ঘাস তাই গবাদিপশুর জন্য নন লিগুম ঘাসের চেয়ে এটা কম লাগবে। কারণ লিগুম ঘাসে আমিষের পরিমাণ বেশি থাকে। যদি একটি গাভীর দৈহিক ওজন ১০০ কেজি হয় তাহলে এর দৈনিক খাদ্য তালিকায় ১.৭৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ১ কেজি শুকনো খড় এবং ৪.০ কেজি বারশিম কাঁচা ঘাস সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে গাভীকে ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় খাওয়ানোর ক্ষেত্রে ০.৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ২.৫-৩ কেজি সবুজ বারশিম কাঁচা ঘাস এবং ২-২.২৫ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় প্রতিদিন দিতে হবে। এই ফর্মূলানুযায়ী গাভীর ওজন অনুপাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের মোট পরিমাণ নির্ধারণ করে এর অর্ধেক সকালে এবং বাকী অর্ধেক বিকালে খাওয়াতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতি
বারশিম ঘাসে ফল হওয়া শুরুর পূর্বে কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে “হে” করে সংরক্ষণ করা যায়। এজন্যে কাটা ঘাস ২-৩ দিন রৌদ্রে ভালোভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় বাঁশের আড়া (কেদোল) দিয়ে দিনে ৫/৬ বার নাড়া-চাড়া করতে হয়। ভালোভাবে শুকানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে ঘাসে কোনক্রমেই ১৪%-এর বেশি আর্দ্রতা না থাকে। তাই ঘাস শুকানোর সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঘাস সঠিকভাবে শুকানোর বিষয়টি জানার জন্য এক মুঠা ঘাস হাতে নিয়ে চাপ দিলে যদি পুরাপুরি ভেঙ্গে না যায় তাহলে বুঝতে হবে ঘাস সঠিকভাবে শুকানো হয়েছে। এই শুকানো ঘাস ঘরে গাদা করে রেখে দিলে দীর্ঘ দিন সংরক্ষিত থাকবে।

উপসংহার
বারশিম ঘাস যদি নিয়মিতভাবে গাভীকে সরবরাহ করা যায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া এতে নন-লিগুম ঘাসের চেয়ে বেশি মাত্রায় আমিষ থাকে বলে আমিষের চাহিদা পূরণেও সহায়তা করে। অন্যদিকে বারশিম ঘাসের শিকড়ে যে “নডিউল” জন্মে তা থেকে নাইট্রোজেন (N2) সরবরাহ করে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। এজন্য দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে কাঁচা ঘাস হিসাবে বারশিম চাষ অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

গো-খাদ্য হিসাবে পারা ঘাসের চাষ

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাণীজ আমিষ যেমন দুধ, মাংস প্রভৃতি উৎপাদনের লক্ষ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে গবাদি পশু প্রতিপালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গবাদিপশুর সুস্বাস্থ্য, জাত উন্নয়ন এবং পশুজাত দ্রব্যাদির উৎপাদন বৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা। অথচ অদ্যাবধি আমাদের দেশে পশু খাদ্য উৎপাদনের জন্য স্বতন্ত্র কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। শুধুমাত্র মনুষ্য খাদ্য উপজাত সমূহই গবাদি পশুর খাদ্য উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দেশের জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ফলে চারণভূমি ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে। এ দেশে মাথা পিছু জমির পরিমাণ মাত্র ০.২৫ একর। তার উপর বাড়তি জনগণের জন্য বসতবাড়ী, অন্যান্য অবকাঠামো এবং কল-কারখানা স্থাপন করতে আবাদী জমি দ্রুত গতিতে হ্রাস পাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে গবাদিপশুর জন্য সবুজ ঘাস উৎপাদনে আবাদযোগ্য জমির ব্যবহার অত্যন্ত দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এতদ্বসত্বেও ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির জন্য আমিষ খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস সৃষ্টির জন্য গবাদিপশু পালনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বর্তমানে পশু সম্পদের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পশুসম্পদ উন্নয়ন কর্মকান্ডে গতি সঞ্চার হয়েছে। তাই গবাদিপশুর জাত উন্নয়নে নানা ধরনের খামার স্থাপনের জন্য জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নতুন কর্মসংস্থানের জন্য পশুপালনের গুরুত্ব এখন সর্বমহলে স্বীকৃত। ইতোমধ্যে দেশে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার স্থাপিত হয়েছে। অথচ ব্যাপক খাদ্যাভাব গবাদি পশুর সার্বিক উন্নয়নকে ব্যাহত করছে এবং প্রজনন, রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ফসল উৎপাদনকে বাধাগ্রস্থ না করে একই আবাদযোগ্য জমি ও বিভিন্ন প্রকার অব্যবহৃত জমি থেকে গবাদিপশুর জন্য খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে পশুসম্পদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে (নিকটস্থ সরকারি পশুসম্পদ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে)। উন্নত জাতের ঘাস চাষের জন্য পতিত জমি, দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময় বা অন্য কোনো ফসলের সাথে আবাদি জমি, নতুন জেগে ওঠা চর, পাহাড়ের ঢাল, সড়ক ও রেল পথের ঢালু এলাকা, সরকারি খাস জমি, উপকূল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, জমির আইল, বাড়ীর আশে-পাশের অব্যবহৃত জায়গা এবং তুলনামূলকভাবে অলাভজনক ফসলের জমিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ উদ্দেশ্যে একটি উচ্চ উৎপাদনশীল ঘাস হিসেবে পারা ঘাসের চাষ কৌশল নিয়ে আজকে আলোচনা করা হচ্ছে।
স্থায়ী ঘাস হিসাবে পারা অন্যতম। এ ঘাস বিভিন্ন নাম যেমন মহিষ ঘাস, পানি ঘাস ইত্যাদি হিসাবে পরিচিত। এ ঘাস জমিতে চাষের পর মাটিতে লতার মত ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প দিনেই সমস্ত জমিতে বিস্তারলাভ করে। এ ঘাসের উৎপত্তি আমেরিকায় হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানের আবহাওয়ায় আবাদ বা চাষযোগ্য। জমিতে একবার রোপন করলে কয়েক বছর পর্যন্ত বিনা চাষে ফলন পাওয়া যায়।

জমি নির্বাচন
পারা ঘাস প্রায় সব ধরনের জমি যেমন উঁচু, নিচু, ঢালু, জলাবদ্ধ এমনকি লোনা মাটিতেও চাষ করা সম্ভব। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় প্রায় সর্বত্রই এর ফলন বেশ সন্তোষজনক। গাছের নীচে, অধিক স্যাঁতস্যাঁতে, জলাবদ্ধ এবং বন্যা প্লাবিত জমি যেখানে অন্যান্য ফসল মোটেই ভাল জন্মে না সেখানে পারা চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। তবে পারা বেশি শীত সহ্য করতে পারে না। যে সব এলাকায় বাৎসরিক বৃষ্টিপাত ১০০ সেমি-এর কম সেখানে পারা উৎপাদন ঠিক নয়।

রোপন সময়
বৈশাখ হতে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পারা ঘাস রোপনের উত্তম সময়। কিন্তু জমি ভিজা বা পানি সেচ দেয়ার সুবিধা থাকলে চৈত্র মাসেও এ ঘাস চাষ করা যায়।
কাটিং
বীজ হিসাবে শিকড়সহ গাছ বা কান্ড ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেক কাটিং বা চারায় ২ বা ৩টি গিটসহ প্রতি ২.৫ একরে ছিটিয়ে বপনের জন্য ১০০০ কেজি দরকার। আর যদি সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়, তাহলে ২.৫ একর প্রতি ১২০০ কেজি কাটিং-এর প্রয়োজন হয়।

জমি চাষ ও রোপন পদ্ধতি
জমির আগাছা নষ্ট করার জন্য জমিতে কমপক্ষে ২-৩টা চাষের প্রয়োজন হয়। জমি ভালমত চাষ এবং আগাছা পরিষ্কার করে এই ঘাস বপন করলে খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় এবং ফলন বেশি হয়।
যদি জমি ভিজা থাকে তাহলে চারা মাটিতে ফেলে লাগানো যায়। আর যদি জমিতে পানি থাকে তাহলে কাটিং-এর মাথা (হেলান ভাবে) লাগাতে হবে। সারিবদ্ধভাবে লাগানোর ক্ষেত্রে এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ২৪-৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ৬-১২ ইঞ্চি হতে হবে।

সার প্রয়োগ
পারার ক্ষেতে সার প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। পারা দ্রুত বর্ধনশীল এবং বছরে অনেকবার কাটা যায়। এ ঘাসের জন্য সারের চাহিদা নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া। সমতল চাষযোগ্য জমিতে পারা চাষের জন্য জমি প্রস্তুতির সময় প্রতি ২.৫ একরে ১০/১২ মে.টন গোবর সার এবং ৮৫ কেজি টিএসপি সার দিতে হবে। ঘাস লাগানোর ২/৩ সপ্তাহ পর প্রতি ২.৫ একরে ৮৫ কেজি ইউরিয়া দিতে হবে। তাছাড়া প্রতি বার ঘাস কাটার পর ৮৫ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করলে ভাল হয়।

পানি সেচ কার্যক্রম
এ ঘাসের জমি সব সময় স্যাঁতস্যাঁতে বা ভিজা রাখতে পারলে ভাল হয়। তাই বছরের শুকনা মৌসুমে পানি সেচ করা প্রয়োজন।

ঘাসের যত্ন
পারা ঘাসের তেমন একটা যত্নের প্রয়োজন হয় না। তবে সঠিক সময়ে ঘাস কাটলে এবং পানি সেচ ও সার প্রয়োগ করতে পারলে এই ঘাস পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপন্ন হয়। প্রতিবার ঘাস কাটার পর জমিতে হালকা চাষ দিয়ে মাটি নরম করে দিতে হবে। ভালভাবে আগাছা পরিষ্কার করে প্রতি ২.৫ একরে ৮৫ কেজি এমোনিয়াম সালফেট সার দিলে প্রত্যাশানুযায়ী ফলন পাওয়া যায়।

সাথী ঘাস চাষ
যদি পারা ঘাস জলাবদ্ধ জমিতে চাষ করা হয় তাহলে কোনো প্রকার লিগুম ঘাসের সাথে চাষ করা যায় না। তবে উঁচু জমিতে চাষ করা হলে সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের লিগুম ঘাস যেমন সেন্ট্রোসীমা, নিরাট্রো ইত্যাদি সাথী হিসাবে চাষ করা যায়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলন
পারা ঘাস লতিয়ে যায় বলে অল্প দিনের মধ্যেই জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘাস রোপনের তিন মাস পর প্রথম বার ঘাস কাটা যায় অথবা গবাদি পশুকে চরিয়ে খাওয়ানোর উপযোগী হয়। বৎসরে প্রায় ৮/১০ বার ঘাস কাটা যায়। প্রয়োজনানুযায়ী সার ও পানি সেচের ব্যবস্থা করতে পারলে বৎসরে প্রতি ২.৫ একর ৯০-১০০ মে. টনের মত সবুজ ঘাস পাওয়া যায়।

ঘাস খাওয়ানোর নিয়ম
গরু মাঠে চরিয়ে কাঁচা ঘাস হিসাবে পারা খাওয়ানো যেতে পারে। তবে মাঠ থেকে কেটে এনে খাওয়ানোই উত্তম। এক্ষেত্রে টুকরা টুকরা করে কেটে খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো ভালো। যদি একটি গাভীর দৈহিক ওজন ১০০ কেজি হয়, তাহলে এর দৈনিক খাদ্য তালিকায় ১.০ কেজি দানাদার খাদ্য ১.৪০ কেজি শুকনা খড় এবং প্রায় ৪.০ কেজি পারা ঘাস সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে যদি এই গাভীকে (১০০ কেজি ওজনের) ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় খাওয়ানো হয়, সেক্ষেত্রে ০.৫ কেজি দানাদার খাদ্য ১.০ কেজি শুকনা খড়, ২.৫-৩.০ কেজি পারা ঘাস এবং ২-২.৫ কেজি ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় প্রতিদিন সরবরাহ করা যেতে পারে।
এই হিসাব অনুযায়ী গাভীর শারীরিক ওজন অনুপাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের মোট পরিমাণ নির্ধারণ করে এর অর্ধেক সকালে এবং বাকী অর্ধেক বিকেলে খাওয়াতে হবে। এর সাথে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

সংরক্ষণ
পারা ঘাস শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে সাইলেজ হিসাবে সংরক্ষণ করাই উত্তম। গাভীর দুধ উৎপাদন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য কাঁচা ঘাসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কাঁচা ঘাসের সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া মাংস ও দুধ উৎপাদন বাড়ানো প্রায় অসম্ভব। সেদিক বিবেচনা করলে উচ্চ ফলনশীল ঘাস হিসাবে পারা ঘাস বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চাষ করা যেতে পারে। আমাদের জমির স্বল্পতা আছে সত্য, তবে অব্যবহৃত জায়গায় পরিকল্পনা মাফিক ঘাস চাষের কৌশল করলে ঘাসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এ জাতীয় উন্নতমানের উচ্চফলনশীল ঘাস গবাদিপশুকে সঠিক নিয়মে খাওয়ানো হলে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা দেশের আমিষ ঘাটতি লাঘবের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে এবং অন্য দিকে দুধ আমদানিতে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তা সাশ্রয় হবে।